প্রসঙ্গ জঙ্গি হামলা; ধর্ম নিয়ে পাগল-প্রলাপ

জঙ্গি হামলা,সন্ত্রাসী হামলা,হামলা,খবর,বাংলা সংবাদ,নিউজিল্যান্ড,নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা,আজকের,নিউজিল্যান্ড মসজিদ,বাংলাদেশের খবর,মসজিদে হামলা,টকশো,জঙ্গি,কে এই হামলাকারী

ফ্রি ফিফটিনের হামলার পর থেকে বিভিন্নজন বিভিন্ন মন্তব্য করে যাচ্ছে। বড় একটা অংশ এই হামলার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বাকি কেউ মিডিয়াকে গালি দিচ্ছে, কেউ আবার খেলোয়াররা বেঁচে ফেরার আনন্দে শহিদদের ভুলে যাচ্ছে― আরও কত কী! তবে সবচে দুঃখজনক হলো অনেকে এ সুযোগে ধর্ম নিয়েও কথা তুলেছে। ধর্মকে নিষিদ্ধ করার কথাও বলছে কেউ কেউ।
একেবারে অযৌক্তিক ও অবাস্তব এই কথাটা দেখে খুব অবাক হলাম― “ব্রেনটনের এই হামলার মাসুল পরবর্তীতে গির্জা, শিনাগগ বা মন্দিরগুলিকে কেমন করে গুনতে হবে তা আসলে বলার অপেক্ষা রাখে না।”
কথাটা যে বলেছে, জন্মপরিচয়ে তাকে মুসলমান হিসেবেই জানি। তবুও কেন সে ইঙ্গিতে মুসলমানদের দিকে আঙুল উঠাল কে জানে? আচ্ছা এমন কোনো নজির আছে কি যে মুসলমানদের উপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে মুসলমানরাও অন্যদের সন্ত্রাস করেছে? বিচ্ছন্ন যাদের দোহাই দেওয়া হবে এদের ব্যাপারে সে একই কথা― উগ্রপন্থিদের ধর্ম উগ্রপন্থা আর সন্ত্রাসীদের ধর্ম সন্ত্রাস। ধর্মের নাম নিয়ে করলেই তো তারা ধর্মের অনুসারী হয়ে যাচ্ছে না!

কাদিয়ানিরা নিজেদের দাবি করে মুসলমান, অথচ ওরা কাফের। তো দেখা যাচ্ছে দাবি করলেই সে বাস্তব প্রমাণিত হয় না― যদি না তার দাবি বাস্তবসম্মত হয়।

এই হামলার মাসুল পরবর্তীতে কেমন করে গুনতে হবে তা আসলে বলার অপেক্ষা রাখে না― এটা বলে যিনি আতঙ্কিত তিনি কি দয়া করে একটু প্রমাণ দেখাতে পারবেন বাবরি মসজিদ শহিদ করার বদলাস্বরূপ ‘ধর্মের অনুসারী মুসলিম’রা কয়টা মন্দির ভেঙেছেন? বা মায়ানমারে মগদস্যুদের মুসলিম নিধনের পর কয়টা জনপদ উজাড় করা হয়েছে? ফিলিস্তিনে কসাই ইহুদিদের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ তারা কীভাবে নিচ্ছে? স্বাধীনতাকামী কাশ্মিরে যে হিন্দু জঙ্গিরা সন্ত্রাস চালিয়েই যাচ্ছে তার মাশুল নিতে হিন্দুদের কয়টা এলাকা কাশ্মির বানানো হয়েছে? না মানে যিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন তা কিসের ভিত্তিতে? যেহেতু ‘গির্জা, শিনাগগ বা মন্দিরগুলি’ স্পষ্টকরে উল্লেখ করা হয়েছে আর হামলাটা হয়েছে মুসলমানদের উপর তাতে তো বুঝাই যাচ্ছে― তার আশঙ্কাটা মুসলমানদের দিক থেকেই, তো কোনো নজির না থাকলে কিসের ভিত্তিতে?

আরেকটা মন্তব্য চোখে পড়ল― “যেইসব মডারেট আর উদারপন্থিরা বলেন যে সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নাই, তারা ভুল। পৃথিবীতে ধর্মকে ঘিরেই সব থেকে বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। সুতরাং টেরর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।”
‘ধর্মকে ঘিরে মানুষ নিহত হওয়া’ আর ‘ধর্মের নাম ভাঙিয়ে মানুষ মারা’তে অনেক তফাত। মুসলমান নামধারী যারা সন্ত্রাসী হামলা চালায় তারাও ধর্মের নাম ভাঙিয়ে মানুষ মারছে― যা ইসলাম সমর্থন করে না। আর অন্যসব ভ্রান্তধর্মের অনুসাররিরা তো ধর্ম-কর্মের ধার-ই ধারে না। ওদের ধর্ম এটাই― পৃথিবী মুসলিমমুক্ত করতে হবে। কেননা কোনো ধর্মেই তো এভাবে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াতে বলেনি!

আর যদি মধ্যযুগের কথা টানেন তো একটু ইতিহাস পড়ে দেখুন তো মুসলমানরা সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে যুদ্ধ করেছিল নাকি অত্যাচারী উৎখাত করতে! প্রসিদ্ধ অনেক খ্রিস্টান ইতিহাসবিদর তো অকপটেই স্বীকার করেছেন যে মুসলমানরা নতুন যে এলাকাতেই গিয়েছে শান্তির বার্তা নিয়েই গিয়েছে। এবং বিজিত অঞ্চলের বাসিন্দারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছে। কেন, আপনারা ভারতের পাশে থেকে বুঝতে পারছেন না এরা আগে কেমন ছিল? ধর্মের নাম ভাঙিয়েই তো এরা জাতিভেদ প্রথা তৈরি করেছিল। আর নিম্নবর্ণের লোকদের উপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছে কোনো বিবেকবান মানুষ কি তা সমর্থন করবে? উপরন্তু তাদের ধর্মটাও মনগড়া তো মনগড়া বিষয় তো আর অরিজিনাল ধর্ম হতে পারে না। এটা বুঝার চেষ্টা করুন― ‘ধর্ম মেনে মানুষ মারা’ আর ‘ধর্মের নাম ভাঙিয়ে মানুষ মারা’ এক নয়।
এ মন্তব্যও চোখে পড়ল― “পৃথিবী এক অর্থে একটা ধর্মীয় প্রতিশোধের শহর।” প্রতিশোধ নেওয়া তো সৃষ্টিজীবের ন্যাচারাল অভ্যাস। শুধু মানুষ কেন― প্রায় সব সবল প্রাণীই প্রতিশোধপরায়ণ। চিতা, হাতি আর উটের প্রতিশোধপ্রবণতা তো প্রবাদতূল্য। তো প্রতিশোধ নিলেই কি ধর্মীয় প্রতিশোধ হয়ে যায়? বলা যেত― “পৃথিবী এক অর্থে একটা প্রতিশোধের শহর।”
ধরুন, ব্রেনটনের এই হামলায় যারা নিহত হয়েছে তাদের প্রিয়জন কেউ একজন এর প্রতিশোধ নিল। আর আপনি তখনই বলে বসবেন― “এটা ধর্মীয় প্রতিশোধ!” কিন্তু আপনি জানারও চেষ্টা করবেন না যে ধর্ম তাকে এ অনুমতি আদৌ দিয়েছে কি না? যেমনটি পূর্বে বলেছি― ‘ধর্ম মেনে মানুষ মারা’ আর ‘ধর্মের নাম ভাঙিয়ে মানুষ মারা’ এক নয়। আর যদি ধর্মের গণ্ডির বাইরে গিয়ে মানুষ মারা হয় তাহলে তো আপনি ধর্মকে দোষারোপ করতে পারেন না!
নসিব খারাপ বলেই হয়তো এ মন্তব্যও দেখতে হলো― “একমাত্র সন্ত্রাসেরই ধর্ম আছে। বেশিরভাগ সন্ত্রাসের পিছনেই মূল কারণ মূলত ধর্ম। মানবপ্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে উচিত সমস্ত রকম ধর্মকে নিষিদ্ধ করা। মন্দির মসজিদ গির্জা― সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাবতীয় ধন-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, সেইখানে স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল খোলা।”
নসিব খারাপ বলেই হয়তো এ মন্তব্যও দেখতে হলো― “একমাত্র সন্ত্রাসেরই ধর্ম আছে। বেশিরভাগ সন্ত্রাসের পেছনেই মূল কারণ মূলত ধর্ম। মানবপ্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে উচিত সমস্ত রকম ধর্মকে নিষিদ্ধ করা। মন্দির মসজিদ গির্জা― সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাবতীয় ধন-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, সেইখানে স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল খোলা।”
মানুষ এখন যে কোনো কাজ করার আগে ধর্মের ব্যাপারে ভাবে। হিন্দুরা তাদের তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ধর্মের লেবেলে করে থাকে। বৌদ্ধরাও ধর্মীয় গুরুদের সাথে নিয়েই মুসলিম নিধনে নামে। খৃস্টানরা ক্রুসেড নাম দিয়ে মুসলমান মারে। আর উগ্রপন্থী নামধারী কিছু মুসলমান তাদের সন্ত্রাস পরিচালনা করে জিহাদ নাম দিয়ে। তার মানে প্রত্যেকে জানে যে ধর্ম এসব কাজের অনুমতি দেয় না, তাই এসব অপকর্মকে ধর্মীয় অন্যান্য অনুমোদিত কাজের নাম দিয়ে দেদারছে করে যাচ্ছে। সে জানে এসব অন্যায় কাজ, ধর্ম এসবের অনুমতি দেয় না। তাই ততটা জিঘাংসা নিয়ে কাজটা করতে পারে না। কিন্তু যদি ধর্মই না থাকে তখন এসব অপকর্ম করতে কোনো প্রতিবন্ধক থাকবে না। হিংস্র বন্য পশু যেমন নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বা উদরপূর্তির জন্য কোনো ভাবে না ধর্ম না থাকলেও সন্ত্রাসীরা কিছু না ভেবেই পশুকেও লজ্জা দিয়ে পাশবিকতা চালিয়ে যেত। কেননা ধর্ম মানুষকে অন্যায় থেকে বাধা দেয়। মনের পশুকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে এই ধর্ম। ধর্ম নিষেধ করলে তখনকার পরিস্থিতি কী হবে কল্পনাও করা যায় না। কাজেই ধর্ম নিষিদ্ধ করার মতো বোকামী আশাকরি বিকেবান কেউ করবে না।

নাসিম মুমতাজী। তরুণ প্রবন্ধকার


Post a Comment

0 Comments